স্বর্ণ ও পরশ পাথর: ইতিহাস, রহস্য ও আবিষ্কারের গল্প
স্বর্ণ বা সোনা—মানব ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর এর সাথেই জড়িয়ে আছে এক জাদুকরী পাথরের নাম, 'পরশ পাথর' (Philosopher's Stone) । যুগ যুগ ধরে মানুষ খুঁজে বেড়িয়েছে এমন এক পাথর, যার ছোঁয়ায় লোহা হয়ে যাবে খাঁটি সোনা। কিন্তু আসলেই কি এই পাথরের অস্তিত্ব আছে? আর সোনাই বা প্রথম কে খুঁজে পেলেন? চলুন, ইতিহাসের পাতা থেকে সেই উত্তর খোঁজা যাক।
১. স্বর্ণ কে আবিষ্কার করেন?
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, সোনা বা স্বর্ণ আসলে কে আবিষ্কার করেছিলেন? টমাস আলভা এডিসন যেমন বৈদ্যুতিক বাতি আবিষ্কার করেছেন, সোনার ক্ষেত্রে কি এমন কোনো নির্দিষ্ট নাম আছে?
উত্তর হলো—না। স্বর্ণের কোনো নির্দিষ্ট আবিষ্কারক নেই।
স্বর্ণ কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা বস্তু নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক মৌল। মানব ইতিহাসের প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ স্বর্ণের সাথে পরিচিত।
প্রাচীন সভ্যতা: প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০-৪০০০ অব্দের দিকেও মানুষ সোনার ব্যবহার জানত। প্রাচীন মিশরে ফারাওদের সময় সোনার ব্যবহার ছিল ব্যাপক। তারা বিশ্বাস করত সোনা হলো ঈশ্বরের গায়ের চামড়া, তাই এটি পবিত্র।
কেন কোনো আবিষ্কারক নেই? সোনা প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় (বিশেষ করে নদীর বালুকণায় বা খনিতে)। প্রাচীন মানুষ চকচকে এই হলুদ ধাতুটি দেখে আকৃষ্ট হয়েছিল এবং এটি নমনীয় হওয়ায় সহজেই তা দিয়ে গয়না তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। তাই বলা যায়, আদিম গুহাবাসী বা প্রাচীন মানুষরাই সম্মিলিতভাবে সোনার প্রথম আবিষ্কারক।
২. পরশ পাথর (Philosopher's Stone) কী?
পরশ পাথর কোনো সাধারণ পাথর নয়। এটি আলকেমি (Alchemy) বা অপরসায়নের এক কিংবদন্তি উপাদান। বিশ্বাস করা হতো, এই পাথরের দুটি জাদুকরী ক্ষমতা আছে: ১. যেকোনো সাধারণ ধাতু (যেমন লোহা বা সীসা) কে স্পর্শ করলেই তা সোনায় পরিণত হবে। ২. এটি দিয়ে 'এলিক্সির অফ লাইফ' বা অমৃত সুধা তৈরি করা যাবে, যা মানুষকে অমরত্ব দান করবে।
৩. পরশ পাথরের ধারণা ও আলকেমিস্টরা
পরশ পাথর বাস্তবে কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি, কারণ এটি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একটি কাল্পনিক বস্তু। তবে এই পাথরের ধারণাটি যারা জনপ্রিয় করেছিলেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা জরুরি:
জাবির ইবনে হাইয়ান (Jabir ibn Hayyan)
অষ্টম শতাব্দীর এই মুসলিম বিজ্ঞানীকে 'রসায়নের জনক' বলা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সব ধাতুই মূলত একই উপাদান দিয়ে তৈরি, শুধু তাদের অনুপাতের ভিন্নতা রয়েছে। তিনি মনে করতেন, বিশেষ কোনো প্রক্রিয়ায় (পরশ পাথরের মাধ্যমে) এই অনুপাত বদলে সাধারণ ধাতুকে সোনায় রূপান্তর করা সম্ভব। তার এই তত্ত্বই পরবর্তী হাজার বছর ধরে আলকেমিস্টদের পরশ পাথর খুঁজতে অনুপ্রাণিত করেছে।
নিকোলাস ফ্লামেল (Nicolas Flamel)
পরশ পাথরের ইতিহাসে সবচেয়ে রহস্যময় নাম হলো নিকোলাস ফ্লামেল। চতুর্দশ শতাব্দীর এই ফরাসি পাণ্ডুলিপি বিক্রেতাকে নিয়ে কিংবদন্তি আছে যে, তিনি নাকি সত্যিই পরশ পাথর তৈরি করতে পেরেছিলেন এবং অমরত্ব লাভ করেছিলেন! যদিও এর কোনো ঐতিহাসিক সত্যতা নেই, তবুও 'হ্যারি পটার' সহ বিভিন্ন পপ কালচারে তাকে পরশ পাথরের স্রষ্টা হিসেবে দেখানো হয়।
৪. বিজ্ঞান বনাম মিথ
বাস্তবে পরশ পাথর খুঁজে পাওয়া না গেলেও, এই খোঁজাখুঁজি বৃথা যায়নি। পরশ পাথর খুঁজতে গিয়েই আলকেমিস্টরা সালফিউরিক অ্যাসিড, ফসফরাস এবং পাতন (distillation) প্রক্রিয়ার মতো অনেক কিছু আবিষ্কার করেছেন, যা আজকের আধুনিক রসায়নের ভিত্তি।
মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের মাধ্যমে আজ ল্যাবরেটরিতে এক ধাতুকে অন্য ধাতুতে (এমনকি সোনায়) রূপান্তর করা সম্ভব, যাকে বলে 'ট্রান্সমিউটেশন'। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় সোনা তৈরি করা এতটাই ব্যয়বহুল যে তা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়।
উপসংহার
স্বর্ণ আবিষ্কার করেছিল প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা আদিম মানুষ, আর পরশ পাথর আবিষ্কারের চেষ্টায় জন্ম হয়েছিল আধুনিক রসায়নের। পরশ পাথর বাস্তবে না থাকলেও, মানুষের জ্ঞানান্বেষণের ইতিহাসে এটি এক উজ্জ্বল রূপক হয়ে বেঁচে আছে। জ্ঞানই হয়তো সেই আসল পরশ পাথর, যা সভ্যতাকে সাধারণ অবস্থা থেকে স্বর্ণযুগে নিয়ে যেতে পারে।
আপনার কি মনে হয়? পরশ পাথরের মতো কোনো কিছুর অস্তিত্ব কি ভবিষ্যতে বিজ্ঞান প্রমাণ করতে পারবে? কমেন্টে জানাতে পারেন!
.png)